
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প মানেই রাঢ় বাংলার মাটি, মানুষ আর ক্ষয়িষ্ণু জমিদারতন্ত্রের এক নিপুণ কোলাজ। তাঁর গল্পে শোষিত মানুষের হাহাকার যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি আর আভিজাত্যের লড়াই।
নিচে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচিত পাঁচটি বিখ্যাত ছোটগল্পের সংক্ষিপ্ত সারমর্ম দেওয়া হলো:
এটি তারাশঙ্করের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন জমিদার বিশ্বম্ভর রায়। তিনি যখন তাঁর আভিজাত্য হারাচ্ছেন, ঠিক তখনই পাশের এক উঠতি ব্যবসায়ী 'মড়ল' তাঁর জৌলুস দিয়ে রায়বাবুকে টেক্কা দিতে চায়। নিজের নিঃস্ব অবস্থা সত্ত্বেও আভিজাত্যের অহংকার ধরে রাখতে বিশ্বম্ভর রায় তাঁর শেষ সম্বলটুকু খরচ করে এক বিশাল জলসা বা বাইজি নাচের আয়োজন করেন। শেষ পর্যন্ত সেই আভিজাত্যের দম্ভ রক্ষা করতে গিয়েই তাঁর ট্র্যাজিক মৃত্যু ঘটে।
পদ্মা বা ময়ূরাক্ষী নদীর পটভূমিতে রচিত এই গল্পটি মানুষের আদিম জীবনসংগ্রাম আর নির্মমতার এক দলিল। তারিণী মাঝি তাঁর স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। কিন্তু যখন ভয়ংকর বন্যায় দুজনেই মৃত্যুর মুখোমুখি হন, তখন প্রাণের মায়া সব ভালোবাসাকে ছাপিয়ে যায়। নিজের প্রাণ বাঁচাতে তারিণী তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী চিনিকে যমের হাতে (জলে) সঁপে দিতে দ্বিধা করেননি। মানুষের বাঁচার ইচ্ছার কাছে আবেগ কতটা তুচ্ছ হতে পারে, এটি তারই গল্প।
এই গল্পে উঠে এসেছে গ্রামীণ বাংলার জাতিভেদ এবং দারিদ্র্যের করুণ চিত্র। একজন ব্রাহ্মণ সন্তানের দারিদ্র্য এবং সমাজের কঠিন নিয়মের বেড়াজালে তাঁর জীবন কীভাবে পিষ্ট হয়, তা এখানে দেখানো হয়েছে। তারাশঙ্কর এখানে মূলত মানুষের অসহায়ত্ব এবং সামাজিক কাঠামোর নিষ্ঠুরতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বৈষ্ণব ধর্মের পটভূমিতে লেখা এক অসাধারণ প্রেম ও ত্যাগের গল্প। মঞ্জরী ও বনওয়ারীর সম্পর্কের মাধ্যমে লেখক এখানে মানুষের মনের আধ্যাত্মিক এবং জাগতিক দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন। তিলক-সেবার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক আবেগ এবং শেষ পর্যন্ত সেই আবেগের শুদ্ধিকরণ এই গল্পের মূল উপজীব্য।
যাযাবর বেদে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা, তাদের বিচিত্র সংস্কার আর অস্থির মনস্তত্ত্ব নিয়ে এই গল্প। এক বেদে কন্যার জীবনের জটিলতা এবং তার প্রেমের টানাপোড়েন এখানে সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে। তারাশঙ্কর দেখিয়েছিলেন যে, মূলধারার সমাজের বাইরেও মানুষের আবেগ-অনুভূতি কতটা তীব্র হতে পারে।
লেখক: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশক: বুকস্ ফেয়ার