জিললুর রহমানের কবিতা অন্য মাত্রার—একথা এই বইয়ের ফ্ল্যাপেই লিখেছিলাম সাতাশ বছর আগে। আজ এই ফ্ল্যাপের প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তবু লিখতে বললে লিখব—জিললুর রহমানের কবিতা বহু মাত্রার, যা আনন্দময় অন্বেষণের বিষয়। আশির দশকে কবি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে অন্য অনেকের মতোই তাঁকে শিল্পের জন্য কবিতা আর জীবনের জন্য কবিতা—এই দ্বিধার অভিজ্ঞতা নিয়ে যে-কোনো পথে যাবার কিংবা নতুন একটা সমন্বিত পথ কেটে যাবার সুযোগ ছিল। জিললুর কোন পথে গিয়েছেন তা বিগলিত সময়ই বলে দিয়েছে। একদিকে বিশ্বব্যাপী তরুণদের স্বপ্নের সমাজতন্ত্রের পতন, অন্যদিকে সামরিক শাসনের দীর্ঘ ছায়ার নিচ থেকে বেরিয়ে অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা; একদিকে কবিতার নামে নৈরাজ্য, অন্যদিকে ঐতিহ্যানুগ শান্ত সমাহিত পথ চলা; একদিকে পরকালের লোভনীয় পুরস্কার অস্বীকার, অন্যদিকে অস্নাত শোকের পয়ার সীবন করে যাওয়া:—প্রিয় পাঠক, এই ছিল কবি জিললুরের যৌবনের অনুধ্যান। জিললুর শুরু থেকেই সমাজ ও রাজনীতি সচেতন। স্লোগানমুখরতা ছাড়াই কীভাবে সমাজ ও রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতিকে কাব্যিকভাবে ভুলে আনা যায় তা আমরা যে-কোনো বয়সেই তাঁর কাছ থেকে শিখতে পারি। তাঁর কবিতায় কোনো অতিকথন নাই; পরিমিতিবোধ তাঁর একটা বৈশিষ্ট্য। তাঁর কবিতার পরতে পরতে আছে আন্তবয়নের মাধ্যমে পঠনের প্রিয় জগৎকে নিত্য নতুন কবিতায় উত্তীর্ণ করার খেলা, আছে স্বদেশভূমি ডুবে যাবার শঙ্কা জয় করে প্রিয়ার ঘাড়ের তিলের সৌন্দর্যে অনার্য দুচোখের মেতে ওঠার উল্লাস, আছে অশনি সংকেত ঠোঁটে ঝুলিয়ে লাল কবুতরের ওড়াউড়ি, বড্ড স্পষ্ট হয়ে একালে এসেছে বেহুলা, অনেক জটিল সমীকরণ নিয়ে ভেসেছে আফ্রোদিতি, আছে অগ্রজ কবির শব্দচয়নের তারিফ, আছে কবিবন্ধুর জন্য এলিজি, আছে সময়কে শিল্পিত রূপে ধারণ করে এক অনিঃশেষ যাত্রার ইশারা। তত্ত্বের অ-আ-ক-খ না জেনেও তাঁর কবিতার রস আহরণ করতে পাঠকের বিন্দুমাত্র শ্রম স্বীকার করতে হয় না। আজ সাতাশ বছর পরে আমাদের দ্রষ্টা কবির ছোটো পরিসরের এই প্রথম বইয়ের অনেক কবিতাই পাঠকের ঠোঁটে মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয়; উচ্চারিত হয়ে চলবে উত্তর প্রজন্মের নতুন পাঠকের ঠোঁটেও। এই কবিতাগুলো বঙ্গীয় উত্তর আধুনিকতার পথিকৃৎ কি না, সে বিচারের ভার কবির সমকালীন পাঠক আর চিরকালীন পাঠকের হাতেই না হয় ছেড়ে দেয়া যাক। মোশতাক আহমদ কবি ও প্রাবন্ধিক